এক প্রেমিকের আত্মকথন

Published by Unknown on  | No comments


মাঝরাত পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণবিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছি কিন্তু ঘুম আর আসছে নাকি করে আসবে? আমার মত অবস্থায় পড়লে এ পৃথিবীর সবচেয়ে পাথর-হৃদয় মানুষেরও নির্ঘুম রাত কাটাবার কথাআর আমি তো সে তুলনায় নিতান্তই সাদাসিধে একজন মানুষযার হৃদয় গ্রীক প্রেম-দেবতা কিউপিডের টার্গেট প্রাকটিসের জন্য নির্ধারিতসেই বুঝতে শেখার পর থেকে আমি শুধু প্রেমে পড়ছি আর ছ্যাঁকা খাচ্ছিতবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগে যে সব ছ্যাঁকা খেয়েছি তার সবই মনে মনেযেমন জীবনের প্রথম ছ্যাঁকাটা খেয়েছিলাম রোমান হলিডে দেখে অড্রেহেপবার্ন কে ভালবেসেকিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যেটা খেয়ে ছিলাম তা একেবারে রাম ছ্যাঁকামোটামুটি দুই বছর প্রেম করার পর জানতে পারলাম আমার প্রেমিকার উচ্চাকাঙ্খা এভারেস্ট শৃঙ্গের চেয়েও উঁচুসে আমার মত মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলের সাথে দু বছর প্রেম করলেও ঘর বাঁধতে পাড়বে নাসেই ছ্যাঁকা খাবার পর ছাত্রজীবনে আর প্রেম করার সাধ হয়নিবিপত্তি বাঁধলো পড়া-শোনা শেষ করে চাকরীতে ঢোকার পরএখনো আমি বুঝতে পারছি না এটাও কি ছ্যাঁকা খেলাম নাকি অন্যকিছুএকটা সম্পর্ক এতো দূর এগিয়ে গিয়ে কি করে ভাঙতে পারে তা আমার মাথায় কিছুতেই আসছে নারাতের পর রাত নির্ঘুম কেটে যাচ্ছেআমার বন্ধুর মত বাবা, আমার একমাত্র ছোট বোন, আমার এমন বিস্রস্ত অবস্থা দেখে হাজারটা প্রশ্ন করছেকিন্ত আমি তাদের প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারিনা
ঘটনার শুরু এক বছর আগেতখন চাকরীতে ঢুকেছি প্রায় দেড় বছর হয়ে গেছেএই দেড় বছরেই চাকরীর প্রতি একটা বিতৃষ্ণা এসে গেছেবুঝে গেছি - মধ্যযুগে রাজা-বাদশাহদের দাসত্ব করাটাই এখন ভোল পাল্টে চাকরীতে রূপান্তরিত হয়েছেএই যখন অবস্থা তখন আমাদের অফিসে ইন্টার্নশিপ করতে এলো আভা নামের একটি মেয়েদেখতে সে এতই সুন্দর যে যেকোন পুরুষের চোখ তার দিকে চুম্বকের মত আকৃষ্ট হবেকাজের ফাঁকেই পরিচয় হলো, কথা হলোআর তাতে বুঝতে পারলাম সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার ভেতর একটা ভদ্র, মার্জিত, প্রখড় বুদ্ধি সম্পন্ন মন আছেএকই মেয়ের ভেতর সৌন্দর্য আর বুদ্ধির সন্নিবেশ আসলেই খুব বিরল ঘটনামনটা আমার আবার কেমন করে উঠলোএমন মেয়ের সঙ্গী হতে পাড়লে তো মন্দ হয় নাকিন্তু কিভাবে কি করবো বুঝতে পাড়ছিলাম নাসারাক্ষণ সে তার চারপাশে একটা দূবত্বের দেয়াল তুলে রাখেঅফিসের অনেক ঝানু মেয়ে-সংহারী চেষ্টা করলো সে দেয়াল ভাঙতেকিন্তু মেয়েটি তার অমায়িক অথচ শীতল ব্যাবহার দিয়ে তাদের সব চেষ্টা ব্যার্থ করে দিলআমি তাই আর এগুনোর সাহস পেলাম না














একদিন অফিস শেষে বাসায় ফিরছিলামবাহন আমার প্রিয় ইয়ামাহা মটরবাইকঅফিস থেকে বের হয়ে বড় রাস্তার মোড়ে আসতেই দেখি আভা দাঁড়িয়ে আছে ট্যাক্সি ধরার আশায়আমি তার কাছে গিয়ে বাইক থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম - কি স্টাফ বাস মিস করেছেন? সে হ্যা সূচক মাথা নাড়লোতখন সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছেতাছাড়া অফিস শেষে ট্যাক্সি পাওয়া আর সোনার হরীন পাওয়া একই কথাতাই সাহস করে বলে ফেল্লাম - কিছু মনে না করলে আপনি আমার বাইকে লিফ্ট নিতে পাড়েনইদানিং ছিনতাই যে হারে বেড়েছে তাতে সন্ধ্যার পর ট্যাক্সিতে একা চড়া নিরাপদ নয়আভা কিছুক্ষণ ভাবলো তারপর বলল - আমি আপনার বাইকে বাসা পর্যন্ত যেতে পারবো নাতাহলে পাড়ার লোকজন আঁড়চোখে তাকাবেআপনি আমাকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারবেন? আমি ওখান থেকে রিক্সা নিয়ে চলে যাবোআমি সানন্দে রাজি হয়ে বললাম - অবশ্যই পারবোসে বলল - আপনার আবার উল্টো হয়ে যাবে না তো? আমি সাথে সাথে জবাব দিলাম - না না উল্টো হবে নাআমার বাসা মিরপুর হলেও আমি উত্তরা যাচ্ছিলাম আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা করতেসে মুচকি হেসে উঠে পড়লো আমার পেছনেতার মাথায় যে বুদ্ধি তাতে ঠিক সে আমার মিথ্যে কথা ধরে ফেলেছে কিন্তু আমাকে বুঝতে দেয় নিআমি তখন খুব সাবধানে বাইক চালাচ্ছিসে আলতো করে তার ডান হাত আমার কাঁধে রেখেছেআমার নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছিলমনে হচ্ছিল এ পথ যদি না শেষ হয় ........
পরের দিন অফিস শেষে আবার একই ঘটনামটরসাইকেল নিয়ে বড় রাস্তায় আসতেই মোড়ে দেখি আভা দাঁড়ানোআমি বাইক থামিয়ে হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলাম - কি আজো বাস মিস? সে হ্যা সূচক মাথা নাড়লোআমি বললাম - চলুন তবে দিয়ে আসিসে হেসে বাইকে উঠে পড়লো, বলল - আজ নিশ্চই আপনার বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন না? আমিও হেসে জবাব দিলাম - না আজ এক বন্ধুকে বাসায় পৌঁছে দিতে যাচ্ছিসে আমার কথায় বেশ মজা পেয়ে খিল খিল করে হেসে বলল - সত্যি কথাটা বলে ফেলি, আজ ইচ্ছে করেই বাস মিস করেছিআসলে গত কাল আপনার বাইকে চড়ে এত ভালো লেগেছে যে আজও খুব লোভ হল আরেকবার বাইকে চড়ারতাই আপনার জন্য এখানে অপেক্ষা করছিলামআমি জানতাম আমাকে দেখে আপনি আবারো লিফট দেবেনআমি খুশি হয়ে বললাম - হু , অবশ্যই লিফট দেবআপনি চাইলে প্রতিদিন লিফট দেবনা না প্রতিদিন দেবার দরকার নেই - আভা আবারো হাসলো - মাঝে মাঝে যখন ইচ্ছা করবে তখন আপনার কাছে আবদার করবোতখন দিলেই চলবেআমি মাথা নেড়ে বললাম ঠিক আছে তাই হবে
এর পরের দুমাস আমাদের এমনি করেই চললসপ্তাহে অন্তত দুদিন আভা আমার মটরসাইকেলে চড়তসে যে এটা খুব উপভোগ করতো তা আমি বুঝতে পারতামএকবার সে নিজেই বলল, মটরবাইকে চড়লে তার নিজেকে পাখীর মত মনে হয়যেন পাখীর মতো সে খোলা আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছেআমার অফিসে সারাটাদিন কাটতো একটাই চিন্তা নিয়ে - আভা কি আজ আমার বাইকে চড়বেআমি উন্মুখ হয়ে অপেক্ষঅ করতাম অফিস শেষ হবার জন্যঅফিস শেষেই ছুটে যেতাম সেই মোড়ের কাছেযেখানে আভা দাঁড়িয়ে থাকে আমার জন্যসে কখনোই অফিসের সামনে থেকে আমার বাইকে উঠতো নাঅফিসের লোকজন আবার কি মনে করে সে সংকোচেরাস্তার মোড়ে গিয়ে যেদিন আভাকে দেখতাম না সেদিন সন্ধ্যা আমার কাছে বিস্বাদ হয়ে যেতকিছুই ভালো লাগতো নাবাসায় গিয়ে চুপচাপ গোঁজ হয়ে শুয়ে থাকতামআর যেদিন সে আমার বাইকে উঠতো সেদিনের সন্ধ্যা আমার কাছে স্বপ্নীল হয়ে উঠতোতার শরীরের নেশাতুর সুবাস আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতোআমার কাঁধে তার আলতো হাত রাখা আমার গোটা শরীরকে যেন অবস করে দিত
আমি অনেক চেষ্টা করেও এ দুমাসে আভার সাথে আমার সম্পর্কটা আরেকটু গাঢ় করতে পারিনিএকটা নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে কখনোই সে আমাকে যেতে দেয়নিতার চারপাশের সেই অদৃশ্য দেয়ালে আমার সব চেষ্টা বৃথাই মাথা কুটে মরেছেকতবার তাকে পৌঁছে দেবার ফাঁকে অনুরোধ করেছি - চলুন আজ আমরা কোথাও থামি একটুকিছু খাইসে মাথা নেড়ে বলতো - না না এমনিতেই সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছেবাসায় দেরী করে গেলে মা বকবেতার এ কথার পিঠে আমি আর কথা বাড়াতাম নাযতটুকু তাকে কাছে পাচ্ছি ততটুকুও যদি বন্ধ হয়ে যায় এই ভয়েপ্রতিবারই সে এয়ারপোর্ট বাসস্ট্যান্ডে নেমে যেততারপর রিক্সা করে বাসায় যেতমাঝে মাঝে ক্ষমা প্রার্থীর মতো বলতো - আমি ভীষণ দুঃখিত যে আপনাকে বাসায় নিতে পারছি নাআমার বাবা-মা খুব রক্ষণশীলআপনার সাথে যে এতদূর বাইকে করে আসি এটা জানলেই তারা তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়ে দেবেআমি মাথা নেড়ে বলতাম - না ঠিক আছেএটা কোন সমস্যাই নয়
এভাবে দিনগুলো আমার বেশ সুখে কেটে যাচ্ছিলকিন্তু একদিন আমার সে সুখ ফুরালোঅফিসে একদিন আভা এসে আমার টেবিলের সামনে দাঁড়ালোবলল - আপনাকে বলা হয়নি, আজ আপনাদের অফিসে আমার শেষদিনআমার ইন্টার্নশিপ শেষ হয়ে যাচ্ছে আজমুহুর্তে যেন আমি মুক-বধির হয়ে গেলামকিছুক্ষণ পর নিজেকে ফিরে পেয়ে বললাম - আজ শেষ দিন আর আপনি আমাকে আজই তা জানাচ্ছেন ? সে বলল - কি ভাবে যে বলবো বুঝতে পারছিলাম নাপ্লিজ আপনি কিছু মনে করবেন না! আমি কিছু না বলে শুধু হেসে মাথা নাড়লামসে মলিন হেসে বলল - আজ আপনার বাইকে শেষবারের মত লিফট চাইবো দেবেন ? আমি এবারো মাথা হেসে মাথা নাড়লামআসলে আমি বলার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম নামনে হচ্ছিল গলার কাছে কি যেন দলা পাকিয়ে আছেআর একটা প্রচন্ড বেদনা আমার বুকটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছিল
অফিস শেষে সেই রাস্তার মোড়ে গেলামদেখি আভা হাস্যোজ্জল মুখে দাঁড়িয়ে আছেঅফিসে খেয়াল করিনি কিন্তু এখন দেখলাম যে আজ তাকে আরো সুন্দর লাগছেসে আজ সেজে এসেছেসাজে কোন উগ্রতা নেইআছে কেবল প্রচ্ছন্ন স্নীগ্ধতাআমাকে থামতে দেখেই সে টুপ করে বাইকে উঠে পড়লোবলল - আজ কিন্তু আমাকে খাওয়াতে হবে! আমি মাকে বলে এসেছি অফিসের শেষদিন বলে আজ ফিরতে দেরী হবে
আমি তাকে আমার প্রিয় একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলামতার পছন্দের খাবার অর্ডার দিলামহাজার চেষ্টা করেও মুখে হাসি ফোটাতে পারছিলাম না আমিবুঝতে পারছিলাম ব্যাপারটা ভালো দেখাচ্ছে নাকিন্তু নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না মোটেইআভার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে হাসছে আর মজা করে খাবার খাচ্ছেআমাকে তাকাতে দেখে বলল - আপনি এমন করছেন যেন আমি আপনার প্রেমিকাআপনাকে ছেড়ে চিরদিনের মত চলে যাচ্ছিআমি লজ্জ্বা পেয়ে মাথা নিচু করলামনিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারছিলাম না বলে নিজের ওপর রাগ হচ্ছিল খুব
খাওয়া শেষে আভাকে এয়ারপোর্ট বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিলামসে তার হ্যান্ডব্যাগ খুলে আমার দিকে একটা প্যাকেট বাড়িয়ে দিলবলল - এটা আপনার জন্যআমি হাত বাড়িয়ে নিলাম তার উপহারবললাম - আর কখনো কি দেখা হবে? আভাও তখন গম্ভীরবলল - জানিনাআমি বললাম - আপনার মোবাইল নম্বরটা কি পেতে পারি? সে বিষন্ন স্বরে বলল - থাক না! নম্বর না হয় নাই নিলেন! আমার কাছে আপনার মোবাইল নম্বর আছেঅফিস থেকে সংগ্রহ করেছিকোনদিন হয়তো আমিই ফোন করবোআপনি ভালো থাকবেনআর আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ এতদিন লিফট দিয়েছেন তাইখুব আনন্দের সময় কেটেছে আপনার সাথে আমারআমি বললাম - আপনিও ভালো থাকবেনআর কখনো আবার মটরসাইকেলে চড়তে ইচ্ছা হলে ফোন করবেন চলে আসবোসে হেসে হাত নেড়ে একটা রিক্সায় উঠে পড়লো
আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে বাইক ঘোরালাম বাসার উদ্দেশ্যেমনে মেঘের ঘনঘটাভাবছিলাম এভাবে কিছু শুরু না হতেই কি ভাবে সব শেষ হয়ে গেল! কিছুতেই আমি এটা মানতে পাড়ছিলাম না

About the Author

Write admin description here..

0 মন্তব্য:

    If you would like to receive our RSS updates via email, simply enter your email address below click subscribe.

Discussion

Blogger template. Proudly Powered by Blogger.
back to top