বসে আছি আমি

Published by Unknown on  | No comments


         তখন আমি কলেজের পাঠ চুকাবো মাত্র, আমাদের শেষ ক্লাস। সবার মন খারাপ। আমারও। একে একে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেছে সবাই, বসে আছি আমি। হঠাৎই জুনিয়র একটা মেয়ে এসে ঢুকলো ক্লাসে। ওর বড়ো আপু স্ট্যান্ড করা ছাত্রী ছিলেন, সেই সুবাদে ওদের বাড়ি যাওয়া আশা ছিলো। ঝড়ের মতো খালি পায়ে এসে ঢুকেই আমাকে দেখে একটু ক্যামন যেনো হয়ে গেলো। টিচারের ডেস্কের কাছে গিয়ে ডেস্কের সাথে ভর দিয়ে আপন মনে নখ খুঁটতে খুঁটতে বললো,
- আর দেখা হবে না? আমিতো অবাক, কি বলে এই মেয়ে! ডালমে কুছ কালা হ্যায়! বললাম
- হবেনা ক্যানো?
- না, আমি জানি।
- কি জানো? আমি তো আছিই এখানে। কোচিং করতে যাবার দেরি আছে, আগে পরীক্ষা শেষ হোক! মুখ নিচু করে সপ্রভিত ভাবে আরক্তিম হয়ে আমারে শুধায়
- আপনার কি কিছুই বলার নেই? আমি তো হতভম্ব! আমি কি বলবো? কিসের কথা বলতেছে এই মেয়ে? মূহুর্তে তার কিছু আচরন আমার চোখের সামনে দিয়ে ফ্লাস ব্যাকের মতো ভেসে গেলো। বুঝলাম মাইয়া আমার প্রেমে পড়েছে! মনে মনে একটু খুশীই হলাম। কিন্তু প্রথম প্রেমের সাম্প্রতিক ছ্যাকার অভিজ্ঞতা আমাকে ঘরপোড়া গরুর মতোই সাবধান করে দিলো।
- কিইবা বলার আছে? বললাম আমি। একটু কাঁদো কাঁদো হয়ে মহিলা আমারে বললেন
- সত্যি কিছু বলার নেই? লে বাবা, কেঁদে দেবে নাকি? আমি আবার কান্নাকাটি সহ্য করতে পারিনা। তাছাড়া এখন তো ফাকাই আছি, কয়েকটাদিন একটু হেসে খেলে পরে বুঝিয়ে বলা যাবে। আর এখন তো ব্যাস্ত থাকবো, প্রেম করার সময় কই? তাই একটু রহস্য করেই বললাম
- কিছু বলার থাকলেই বা শুনছে কে? মেয়ের মুখ দেখি পূর্নিমার চাঁদের মত ঝলমল করে উঠলো! বললো
- বুঝেছি, আপনার আর বলা লাগবে না। আপনার মোবাইল নাম্বারটা লিখে দেন তো! (তখন নয়া নয়া মোবাইল কিনছি! চরম ভাব!) লিখে দেয়ার সাথে সাথে মেয়ে পালাইলো। যাওয়ার আগে আস্তে করে চিঠি লিখতে বলে গেলো। (তখনো চিঠি চলতো)
যাউগ গা, বাঁচা গেলো! এমন এক্টা ভাব নিয়ে কি হইলো না হইলো এই চিন্তা করতে করতে বাড়ি ফিরলাম। এরপর তো পরীক্ষা, কোচিং এ দৌড়া দৌড়ি, ভার্সিটিতে ভর্তি এই সব নিয়ে খুব ব্যাস্ত হয়ে পড়ায় তেমন যোগাযোগ হলোনা। সর্বসাকুল্যে তিন খান চিঠি আর বারকয়েক মোবাইলে আলাপ। মাঝে কলেজে গেলে দু-একবার দেখা সাক্ষাৎ। এরই মাঝে তিনিও কোচিং করার জন্য ঢাকায় পদার্পন করেছেন, হাতে এসেছে মোবাইল সেট। আজব! ঢাকায় এসে কোন খোঁজ খবর নেই যে! ভাব্লাম মোহ ছুটছে এতদিনে! কিসের কি? মাস তিনেক পরে হঠাৎ ফোন!
-ক্যামন আছো?
- এইতো ভালো, তোমার খবর কি?
- চলছে...... কোচিং, ব্যাবসা নিয়ে খুব বিজি। এইবার আমার তব্দা খাওয়ার পালা, কয় কি মেয়ে! ঢাকায় আসতে পারলোনা, ব্যাবসা! কাহিনী কি?
- কিসের ব্যাবসা? পড়াশুনা ঠিকমতো করছ তো?
- এই তো, সবাই মিলে একটা ব্যাবসা করছি আরকি। দেখা হলে বলবো। আমি তোমার কাছে একটা জিনিস চাইবো, তুমি দিবা?
- কি জিনিস?
- দেখা হলে বলবো।
- আগে শুনবো কি জিনিস, তারপর বলতে পারবো।
- আচ্ছা, তাহলে পরশু আসো শাহবাগ।
- ঠিক আছে।
- বাই, লাভ ইউ। (এই প্রথম বল্লো!) আমি থতমতো খেয়ে
- হ্যা, বাই। আচ্ছা রাখি...
ভাফ্রে! ঢাকার বাতাস দেখি ভালোই লেগেছে! ভাবছিলাম আর মনে মনে টেনশন, কি চাইবে? দামী কোন কিছু নাকি? নাকি, হে হে হে……মানে অন্যকিছু? দেখা যাক…
নির্ধারিত সময়ের ঘন্টাখানিক পরে পৌঁছুলাম যথারিতী। কিছু বললো না। সাথে করে ঘুরে নিয়ে বেড়ালো, ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা দিলাম। এরই মাঝে দুই তিন বার ফোন এলো ওর মোবাইলে। চাপা স্বরে কাকে য্যানো বলে, “হ্যা, সাথেই আছে। আসবো অফিসে ঘন্টা খানিক পর” আমি শুনতে না চাইলেও শুনে ফেললাম। ভাব্লাম কোন বান্ধবীকে হ্য়তো বলছে! জিগাইলাম
- কি চাইবা বলছিলা, চাইলা না তো?
- আজ না, আরেকদিন চাইবো।
- আচ্ছা। মনে মনে ভাবি, বাঁচলাম! আজ পকেটে বেশী টাকা নাই।
আমার সাথে ঘুরলেও, ওকে ক্যামন জানি অস্থির মনে হচ্ছিলো। আগের মত আমিও ঠিক কম্ফোর্টেবল ফিল করছিলাম না। ও হঠাৎ বললো,
- আজ আর অফিসে যাবো না। বাসায় যাবো।
- তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি?
- হুম, চলো।
বাসে উঠে দুজনেই চুপচাপ। একটু পর এ কথা সে কথা বলতে বলতে আমার হাত চেপে ধরলো। সেই প্রথম! আমি একটু ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেলেও বাইরে ভাব দেখালাম কিছুই হয়নি, খুব স্বাভাবিক ব্যাপার! ও বললো
- আমি জানি, তোমার অনেকদিনের ইচ্ছা আমার হাত ধরার তাই না?
- হুম।
- আমাকে একটা কথা দিবা?
- কি?
- আমার স্বপ্ন আমি নিজেই ব্যাবসা করবো, তুমি আমার পাশে থাকবা তো? হে হে হে, আমিতো তখন চাঙ্গে! গু খাইতে বললে তাতেও রাজী! গম্ভির হয়ে বললাম
- আমি থাকবোনা তো কে থাকবে?
ও নিশ্চিন্ত হয়ে আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলো। আমি দু একবার আবারো হাতটা ধরার ঈঙ্গিত করলাম নির্লজ্জের মতো। সে দেখেও না দেখার ভান করে থাকলো।
তার সপ্তাখানিক পরের কথা। আবার দেখা হলো দুজনার। নিউমার্কেটে নিয়ে গিয়ে পাক্কা নয়শত টাকা দিয়ে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ কিনে দিলাম। চাকরী করি তখন একটা, মাসে মোটা মাইনে পাই পার্ট-টাইম করার পরও। ভদ্রমহিলা আমার সাথে ভালোই ঘোরাফেরা করলেন, খাই-দাই চললো। রেস্টুরেন্টের আধাঁর চিপায় বসে আবারো আমার হাত ধরলেন তিনি, বললেন
- আমার সাথে আমার অফিসে যাবা একটু? আমার বস তোমাকে দেখতে চেয়েছেন। লে হালুয়া, আবার অফিস/বস এইগুলা ক্যান? মনে মনে ভাবি।
- হ্যা, যাবোনা ক্যানো। কিন্তু ক্যানো বলতো?
- উনি চান আমি আর তুমি এক্ সাথে বিজনেস করি, তুমি আমাকে হেল্প করবে না বলো? বলেই হাতে একটা জোরে চাপ! আমি কি আর না বলতে পারি? ফর্সা, দীর্ঘাঙ্গী সুন্দরীর হাতের চাপে তখন আমি দুই চোখে বাসরঘর দেখতাছি!
- অবশ্যই করবো। কিন্তু কি বিজনেস?
- অফিসে চলো সব জানতে পারবা।
- কোথায় অফিস?
- পল্টনে।
- আচ্ছা, চলো।
তিনি রিক্সায় করে আমার গা ঘেঁসে বসে মোবাইলে বসের সাথে কথা বলতে বলতে যাচ্ছেন
- হ্যা, এইতো আমরা আসতেছি…

পল্টনে এক বিল্ডিং এর দোতালায় নিয়ে গেলো আমার প্রেয়সী, দেখি দরজায় লেখা “ডেস্টিনি- ২০০০ লিঃ” তখনি আমার বোঝা কমপ্লিট! বড়ই অনিচ্ছা সত্বেও গেলাম। আমাকে বিনেস প্লান বোঝানো হলো। সুন্দরীর টানে কয়দিন কয়দিন ট্রেনিং ও করলাম। তখনো জয়েন করিনি। আমাকে জয়েন করার জন্য সুন্দরী ও তার বস বহু চাপ প্য়োতখগ করতে লাগলো। তাও জয়েন করিনি টাকার সমস্যার কথা বলে। সুন্দরীরে বোঝাই আমি আছি তো! পালিয়ে তো আর যাচ্ছি না! কিন্তু তার দেখি আর আমার প্রতি কোন খেয়াল নেই! কোথায় সেও মধুর মধুর বাক্য? কোথায় তার প্রেম? একদিন ট্রেনিং শেষে সেই বস আমাকে জিজ্ঞাসা করেন কোন মেয়ে আমার প্রতি দূর্বল কিনা, তাকে আমি সেখানে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যেতে পারবো কিনা! তখনি ব্যাপারটা জলবৎ তরলং হয়ে গেলো। আমি সুন্দরীর সাথে জোর করে ডাইরেক্ট কনভার্সেশনে গেলাম
- ডু ইউ লাভ মি অর নট?
- দেখুন আমি আপনাকে অত্যান্ত শ্রদ্ধা করি!
- আই আস্কড, ডু ইউ লাভ মি অর নট? তিনি মিন মিন করে আবার বললেন
- আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি।
- দ্যাট মিনস ইউ ডোন্ট লাভ মি!
তিনি নিরুত্তর! সেই যে বের হলাম সেই বিল্ডিং থেকে, আর ফিরে যাইনি। আর তিনি? নাম্বারটা মুছে ফেলেছি, ক্যামন আছেন বলতে পারিনা…

About the Author

Write admin description here..

0 মন্তব্য:

    If you would like to receive our RSS updates via email, simply enter your email address below click subscribe.

Discussion

Blogger template. Proudly Powered by Blogger.
back to top